বদ্ধ-জীবন থেকে মুক্তির উপায়


বদ্ধ-জীবন থেকে মুক্তির উপায়

ধর্মের অন্তর্গত চারটি মৌলিক বিষয় অর্থনৈতিক হচ্ছে- পুণ্যকর্ম, উন্নতি, ইন্দ্রিয় সুখভােগ এবং চরমে জড়জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি। সুতরাং চরম লক্ষ্য হলাে এ বদ্ধজীবন থেকে মুক্তিলাভ। সবদিক দিয়েই আমরা আবদ্ধ হয়ে রয়েছি, তার অনুভব শ আমরা করতেই পারছি। যেই হ মাত্র আমরা একটা জড় শরীরে মা প্রবেশ করছি, তৎক্ষণাৎ আমরা ব বদ্ধ হয়ে পড়ছি। ঠিক যেমন আমরা কোনাে একটা রাজ্যে ঢুকছি.....এই যেমন ধরুন আমরা f ভারত থেকে আপনাদের রাজ্যে এসেছি। অমনি আমি এখানকার বিদেশ দফতরের অধীনে বদ্ধ হয়ে পড়েছি। তাে এটাই জড়জাগতিক ব্যবস্থা। যে মুহূর্তে ব আপনি একটা বিশেষ শরীর পাচ্ছেন, আপনি বদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। যখন আমরা এখানকার সেন্ট জেমস পার্কের ধারে হেঁটে নি চলি, তখন ওখানকার হাঁসগুলাে যেই মাত্র দেখে আমরা কাছে আসছি, অমনি তারা জলে ঝাপিয়ে পড়ে। হাঁস ভাবে, সে জলেই নিরাপদ। আর ভাবে, আমাকে যদি জল থেকে টেনে তােলে, তা হলে চেঁচিয়ে প্রতিবাদ জানাব।

হাঁসটা একটা জীব, একটা প্রাণী। আমিও একটা 1. জীব। আমাকে জলে ডুবিয়ে দিলে আমি ভয় পাই, আর ও জলেই আশ্রয় খোঁজে। সেই একই জল। কেন একজন তাতে আশ্রয় খোজে, আর অন্যজন তাতে ভয় পায়? এটাই হলাে জড় জগতের নিয়ম। কারণ আমি একটা বিশেষ শরীরে বদ্ধ, আর হাঁস অন্য এক ধরনের বিশেষ শরীরে বদ্ধ। গাছেদের মধ্যে দেখি- কিছু গাছ আছে, ওপরের দিকে উঠে যায় এবং কিছু গাছ যায় নিচের দিকে। এগুলাে বদ্ধ জীবনের লক্ষণ। দেহযােগেন দেহিনাম। বিভিন্ন ধরনের এভাবে আমরা শরীরের মধ্যে বিভিন্নভাবে বদ্ধ হয়ে রয়েছি। তাই মুক্তি মানে হলাে কেউ কোনাে বদ্ধ অবস্থায় থাকবে। না। ঠিক যেমন - ভগবান শ্রীকৃষ্ণ,তিনি কোনো র ক মভাবেই বদ্ধ অবস্থার মধ্যে নন। বলে আমরাও তাকেই মুক্তি। পারি, কারণ আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই বিভিন্নাংশ, তাই বদ্ধঅবস্থা থেকে আমরাও মুক্ত হয়ে উঠতে পারি। ঠিক যেমন নারদ মুনি। নারদ মুনি অন্তরীক্ষে ভ্রমণ করে বেড়ান, কারণ তিনি মুক্তাত্মা। তিনি বদ্ধ নন। কিন্তু আমরা যেহেতু বদ্ধ জীব, তাই কোনাে রকম যন্ত্র বা ঐ ধরনের কিছু একটা আকাশযান না পেলে আমরা মহাশূন্যে যেতেই পারি না। এ বদ্ধ জীবনের লক্ষণ আপনারা জড়জগতের যেখানেই যাবেন, সেখানেই দেখতে পাবেন।

অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড আছে আর প্রত্যেকটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিভিন্ন ঋতু-পরিবেশ সমেত অসংখ্য গ্রহ আছে। ঠিক যেমন আমরা পৃথিবী থেকে ভিন্ন ধরনের আবহাওয়া-পরিবেশ চাঁদে আছে বলে জেনেছি। সূর্যের আবহাওয়া-পরিবেশ পৃথিবী কিংবা চাদের আবহাওয়া-পরিবেশ থেকে ভিন্ন। প্রত্যেকটি গ্রহ, প্রত্যেকটি ব্ৰহ্ম্ ভিন্ন আবহাওয়া-পরিবেশ আর প্রকৃতির মাঝে বদ্ধ। সেটাই শুগবান শ্রীকৃষ্ণের সৃষ্টির সৌন্দর্য। এল। ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁরভক্তিগীতিতে গেয়েছেন কেশব তুয়া জগত বিচিত্র- “হে কেশব, হে শ্রীকৃষ্ণ, আপনার সৃষ্টি ?বৈচিত্র্যের পরি পণ। সত্যিই তাই। কিন্তু এ বৈচিতোর সমস্ত আমাদের খুব পছন্দ হয় । সমর বৈচিত্র্যের বন্ধন থেকে আমরা মুক্তি পাবার চেষ্টা করছি। সেই মুক্তি হলাে আমাদের চরম লক্ষ্য। তাই ভাগবতের প্রথম ফ্ন্ধের প্রথম অধ্যায়ের তাৎপর্য আলোচনা প্রসঙ্গে মিলের এ কথাই বলতে হয় যে, ধর্মের অন্তর্গত চারটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে পুণ্যকর্ম, অর্থনৈতিক উন্নতি, ইন্দ্রিয় সুখভোগ্য এবং চরমে জড়জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি। তা হলে চরম লক্ষ্যযখন মুক্তিলাভ, তখন সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সবকিছুতে সামঞ্জস্য করে নিতে হবে। সেই কাজটাই হলাে মানব সভ্যতা! আসল কাজ।

বৈদিক সভ্যতা এ মতবাদের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে যে, সমস্ত জীবই বন্ধ জীব। কেন তারা বন্ধ জীব, কীভাবে বদ্ধ হলাে? তার কারণ হলাে তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিরােধী হয়ে উঠেছিল। তারা শ্রীকৃষ্ণের অনুকরণ করতে চেয়েছিল। এ মনােবৃত্তি তাে সর্বত্র রয়েছে। যেমন হিপিরা বলে, "আমরা কোনাে কিছুই গ্রাহ্য করি না, দেশের আইন, বা পুলিশ যা কিছুই হােক।" সেখানেও ভাবখানা হচ্ছে এই যে, সকলেই তারা মুক্তি চাইছে। কারণ সেটাই আমাদের অরূপগত অবস্থা। মুক্তি চাই। প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশ্। আপনি স্বেচ্ছায় এ জড় শরীরটি ধারণ করেছেন জড়জাত উপভােগ করার জন্য। এখন কথা হলাে এই যে, মানব জীবনে, সভ্য মানুষের জীবনে, আপনাদের চেতনাশক্তি উন্নত হয়ে উঠেছে। তাই আপনারা বদ্ধ জীবন চান না; আপনারা মুক্তি চান। এ মুক্তির প্রশ্ন জেগেছে মানব জীবনে, জাগেনি কুকুরের জীবনে, বেড়ালের জীবনে। না। অতএব আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্য প্রাণীদের জীবন আর আমাদের এই জীবনের পার্থক্য রয়েছে

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

Post a Comment

0 Comments